২০২৬ সালে নামজারি করতে কি কি লাগে, কত টাকা ও কতদিন সময় লাগে

জমি ক্রয়, উত্তরাধিকার বা দান সম্পত্তি অর্জন করার পর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ হলো নামজারি করা। কিন্তু অনেকেই জানেন না যে নামজারি করতে কি কি লাগে এবং এটি সম্পন্ন করতে কী পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হয়। এই আর্টিকেলে আমরা নামজারির সম্পূর্ণ প্রক্রিয়া, প্রয়োজনীয় কাগজপত্র, খরচ এবং সময়সীমা সম্পর্কে বিস্তারিত জানাব।
জমি নামজারি বা খারিজ (Mutation) কী এবং কেন করতে হয়?
নামজারি বা খারিজ হলো সরকারি ভূমি রেকর্ডে জমির মালিক পরিবর্তন করার একটি আইনি প্রক্রিয়া। যখন কোনো জমির মালিক নতুন ব্যক্তির কাছে পরিবর্তিত হয়, তখন সেই পরিবর্তন সরকারি খতিয়ান বা রেজিস্টারে আপডেট করতে হয়।
নামজারি না করলে আইনি জটিলতা সৃষ্টি হতে পারে। উদাহরণস্বরূপ, যদি আপনি জমি কিনে নামজারি না করেন, তাহলে ব্যাংক লোনের জন্য জমি বন্ধক রাখতে পারবেন না। এছাড়াও ভবিষ্যতে জমি বিক্রয়, দান বা উত্তরাধিকার সূত্রে হস্তান্তরের ক্ষেত্রে সমস্যা দেখা দেবে।
রেকর্ড আপডেট না থাকলে তৃতীয় পক্ষ জমির দাবি করতে পারে। এমনকি আপনার নিজের সম্পত্তির উপর অধিকার হারানোর ঝুঁকি থাকে। তাই সময়মতো নামজারি করা অত্যন্ত জরুরি।
আরও পড়ুন:
Top 8 Car Insurance Companies in South Africa (Stop Wasting Your Rands on High Premiums!)
অনলাইনে নামজারি করতে কি কি লাগে? (প্রয়োজনীয় কাগজপত্র)
নামজারি আবেদনের জন্য প্রয়োজনীয় কাগজপত্র জমি অর্জনের পদ্ধতির উপর নির্ভর করে। বিভিন্ন ধরনের জমির জন্য ভিন্ন ভিন্ন ডকুমেন্ট প্রয়োজন।
ক্রয়কৃত বা সাফ কবলা জমির ক্ষেত্রে
যদি আপনি জমি ক্রয় করে থাকেন, তাহলে নিম্নলিখিত কাগজপত্র জমা দিতে হবে:
- মূল দলিল বা সার্টিফাইড কপি – বিক্রেতা এবং ক্রেতা উভয়ের স্বাক্ষরিত ক্রয় দলিল
- পূর্বের খতিয়ান – বিক্রেতার নামে জমির পুরনো খতিয়ানের কপি
- জমির নকশা – সার্ভে বিভাগ থেকে প্রাপ্ত জমির মানচিত্র
- জাতীয় পরিচয়পত্র (আইডি কার্ড) – নতুন মালিক এবং বিক্রেতা উভয়ের NID কপি
- পাসপোর্ট সাইজের ছবি – নতুন মালিকের ২ কপি ছবি
- ট্যাক্স পরিশোধের প্রমাণ – যদি দলিল রেজিস্ট্রি করা হয়ে থাকে
এছাড়াও সম্পত্তি বর্ণনা এবং সীমানা সম্পর্কিত তথ্য সঠিকভাবে পূরণ করতে হয়।
ওয়ারিশ সূত্রে প্রাপ্ত জমির ক্ষেত্রে
উত্তরাধিকার সূত্রে জমি পাওয়ার ক্ষেত্রে ভিন্ন ধরনের কাগজপত্র দরকার। এই ক্ষেত্রে আপনাকে যা জমা দিতে হবে:
আরও পড়ুন:
বিনা ভোগান্তিতে পাসপোর্ট সংশোধন করার নিয়ম সহজ পদ্ধতি 2026
- ওয়ারিশ সনদ – ইউনিয়ন কাউন্সিল বা নোটারি থেকে প্রাপ্ত ওয়ারিশ সার্টিফিকেট
- মৃত্যু সনদ – সম্পত্তির প্রকৃত মালিকের মৃত্যু সনদ
- আপস বণ্টননামা দলিল – যদি উত্তরাধিকারীরা নিজেদের মধ্যে সম্পত্তি ভাগাভাগি করে থাকেন
- পূর্বের খতিয়ান – মৃত ব্যক্তির নামে জমির পুরনো রেকর্ড
- সকল ওয়ারিশের NID কপি – যারা নামজারিতে আবেদন করছেন তাদের সবার পরিচয়পত্র
- পাসপোর্ট সাইজের ছবি – সকল ওয়ারিশের ছবি

হেবা বা দানপত্র জমির ক্ষেত্রে
যদি জমি দান বা হেবা সূত্রে পান, তাহলে এই কাগজপত্রগুলো প্রয়োজন:
- হেবা বা দানপত্র দলিল – দাতা এবং প্রাপকের স্বাক্ষরসহ সম্পূর্ণ দলিল
- দাতার খতিয়ান – যে ব্যক্তি জমি দান করছেন তার নামে জমির রেকর্ড
- উভয় পক্ষের NID কপি – দাতা এবং প্রাপক উভয়ের পরিচয়পত্র
- পাসপোর্ট সাইজের ছবি – প্রাপকের ২ কপি ছবি
- জমির নকশা – সার্ভে অফিস থেকে প্রাপ্ত নকশা
অনলাইনে ই-নামজারি আবেদন করার নিয়ম (সংক্ষিপ্ত পদ্ধতি)
বাংলাদেশ সরকারের ভূমি মন্ত্রণালয় এখন সম্পূর্ণ অনলাইন ভিত্তিতে নামজারি সেবা প্রদান করছে। এর ফলে আপনি ঘরে বসেই আবেদন করতে পারেন।
ই-নামজারি পোর্টাল: mutation.land.gov.bd
আবেদন প্রক্রিয়া খুবই সহজ। প্রথমে আপনাকে পোর্টালে একটি অ্যাকাউন্ট তৈরি করতে হবে। এরপর আপনার জেলা, উপজেলা এবং মৌজা নির্বাচন করে জমির খসরা নম্বর এবং দাগ নম্বর প্রবেশ করতে হবে।
আরও পড়ুন:
কানাডা জব ভিসা ২০২৬। জেনে নিন খরচ সহ অন্যান্য সকল তথ্য
সকল প্রয়োজনীয় তথ্য পূরণ করে আপনার কাগজপত্রের ডিজিটাল কপি (PDF বা JPG ফরম্যাটে) আপলোড করুন। নিশ্চিত করুন যে ছবিগুলো স্পষ্ট এবং পঠনযোগ্য।
আবেদন জমা দেওয়ার পর আপনি একটি অ্যাপ্লিকেশন রেফারেন্স নম্বর পাবেন। এই নম্বরটি সংরক্ষণ করুন, কারণ এটি দিয়ে আপনি যেকোনো সময় আপনার আবেদনের অগ্রগতি ট্র্যাক করতে পারবেন।

নামজারি করতে কত টাকা লাগে? (সরকারি ফি এর হিসাব ২০২৬)
নামজারির খরচ মূলত সরকারি ফি-এর উপর নির্ভর করে। এটি জমির আকার বা মূল্যের উপর ভিত্তি করে পরিবর্তিত হয় না, বরং নির্দিষ্ট হারে নির্ধারিত।
অনলাইনে আবেদন ফি ও নোটিশ জারি ফি
অনলাইনে আবেদন করার সময় প্রথম দুটি ফি জমা দিতে হয়:
- আবেদন ফি: ২০ টাকা – এটি আপনার আবেদন নথিভুক্ত করার জন্য
- নোটিশ জারি ফি: ৫০ টাকা – স্থানীয় জনগণকে নোটিশ প্রকাশের জন্য
এই দুটি ফি একসাথে ৭০ টাকা বিকাশ, নগদ বা ই-চালানের মাধ্যমে পেমেন্ট করতে হয়।
রেকর্ড সংশোধন ও খতিয়ান সরবরাহ ফি
নামজারি অনুমোদিত হওয়ার পর আপনাকে আরও দুটি ফি প্রদান করতে হবে:
- রেকর্ড সংশোধন ফি: ১০০০ টাকা – সরকারি খতিয়ানে পরিবর্তন আনার জন্য
- খতিয়ান সরবরাহ ফি: ১০০ টাকা – নতুন খতিয়ান ডেলিভারির জন্য
এই ফিগুলো নামজারি অনুমোদনের পর সংগ্রহ করা হয়।

সর্বমোট সরকারি খরচ ও পেমেন্ট পদ্ধতি
সম্পূর্ণ সরকারি ফি: ১১৭০ টাকা
এর বিভাজন হলো:
| খাত | পরিমাণ |
|---|---|
| আবেদন ফি | ২০ টাকা |
| নোটিশ জারি ফি | ৫০ টাকা |
| রেকর্ড সংশোধন ফি | ১০০০ টাকা |
| খতিয়ান সরবরাহ ফি | ১০০ টাকা |
| মোট | ১১৭০ টাকা |
পেমেন্ট করার জন্য আপনি বিকাশ, নগদ, রকেট বা ই-চালান ব্যবহার করতে পারেন। অনলাইন পোর্টালে পেমেন্ট অপশন উপলব্ধ থাকবে।
জমি নামজারি হতে কতদিন সময় লাগে?
নামজারির সময়সীমা সরকারি নিয়ম দ্বারা নির্ধারিত। তবে বিভিন্ন পরিস্থিতিতে এটি ভিন্ন হতে পারে।
সাধারণ ক্ষেত্রে নামজারির সময়সীমা
সাধারণ পরিস্থিতিতে নামজারি সম্পন্ন হতে সর্বোচ্চ ২৮ কার্যদিবস সময় লাগে। এই সময়ের মধ্যে নিম্নলিখিত পদক্ষেপগুলো সম্পন্ন হয়:
- প্রথম ৭ দিন: আবেদন পরীক্ষা এবং প্রাথমিক যাচাইকরণ
- দ্বিতীয় ৭ দিন: জনসাধারণের জন্য নোটিশ প্রকাশ এবং আপত্তি গ্রহণ
- তৃতীয় ৭ দিন: আপত্তি বিবেচনা এবং চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত
- চতুর্থ ৭ দিন: খতিয়ান সংশোধন এবং ডেলিভারি
যদি কোনো আপত্তি আসে, তাহলে অতিরিক্ত সময় লাগতে পারে।
প্রবাসী বা বিশেষ ক্ষেত্রে সময়সীমা
বাংলাদেশের বাইরে থাকা প্রবাসীদের জন্য সরকার বিশেষ সুবিধা প্রদান করে। প্রবাসীরা ফাস্ট ট্র্যাক সেবা নিয়ে নামজারি ৯ থেকে ১২ দিনের মধ্যে সম্পন্ন করতে পারেন।
এই সুবিধা পেতে আপনাকে পাসপোর্ট কপি এবং প্রবাসের প্রমাণ জমা দিতে হবে। তবে এর জন্য অতিরিক্ত ফি নেওয়া হতে পারে।
বিশেষ ক্ষেত্র যেমন সংঘর্ষপূর্ণ জমি বা জটিল আইনি সমস্যার ক্ষেত্রে সময় আরও বৃদ্ধি পেতে পারে।
নামজারি আবেদনের সর্বশেষ অবস্থা যাচাই করবেন কীভাবে?
অনলাইনে আবেদন করার পর আপনি যেকোনো সময় আপনার আবেদনের স্ট্যাটাস জানতে পারবেন। এটি করা অত্যন্ত সহজ এবং দ্রুত।
ই-নামজারি পোর্টাল (mutation.land.gov.bd) এ যান এবং আপনার অ্যাকাউন্টে লগইন করুন। এরপর আপনার অ্যাপ্লিকেশন রেফারেন্স নম্বর বা ট্র্যাকিং নম্বর প্রবেশ করুন।
সিস্টেম আপনাকে আপনার আবেদনের বর্তমান অবস্থা দেখাবে। আপনি জানতে পারবেন:
- আবেদন কি গৃহীত হয়েছে
- নোটিশ প্রকাশিত হয়েছে কিনা
- কোনো আপত্তি এসেছে কিনা
- অনুমোদন হয়েছে কিনা
- খতিয়ান ডেলিভারির জন্য প্রস্তুত কিনা
আপনি চাইলে স্থানীয় সার্কেল অফিসে সরাসরি গিয়েও আপনার আবেদনের খবর জানতে পারেন।

নামজারি আবেদন বাতিল হলে করণীয় কী?
কখনো কখনো নামজারির আবেদন বাতিল হয়ে যায়। এটি বিভিন্ন কারণে হতে পারে। বাতিল হওয়ার পর আপনার করার বিকল্প রয়েছে।
আবেদন বাতিল হওয়ার সাধারণ কারণ:
- কাগজপত্রে ত্রুটি বা অসম্পূর্ণতা
- জমির সীমানা নিয়ে বিরোধ
- মালিকানা সম্পর্কে আপত্তি
- দলিল জালিয়াতির সন্দেহ
- ট্যাক্স বা অন্য সরকারি বকেয়া
আবেদন বাতিল হলে আপনি মিসকেস (Misc Case) দাখিল করতে পারেন। এটি একটি আইনি প্রক্রিয়া যেখানে আপনি বাতিলের কারণ চ্যালেঞ্জ করতে পারেন।
অথবা আপনি আপিল করার সুযোগ পান। সার্কেল অফিসের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আপনি জেলা প্রশাসকের কাছে আপিল করতে পারেন।
এই প্রক্রিয়ায় আপনাকে আইনজীবী বা ভূমি বিশেষজ্ঞের সাহায্য নিতে হতে পারে। তবে যদি কারণ সহজ হয়, তাহলে সংশোধিত কাগজপত্র জমা দিয়ে নতুন আবেদন করতে পারেন।
সচরাচর জিজ্ঞাসা (FAQ)
নামজারি না করলে কি হয়?
নামজারি না করলে আপনি আইনিভাবে জমির মালিক হিসেবে স্বীকৃত হবেন না। এর ফলে ব্যাংক লোন পাওয়া, জমি বিক্রয় করা বা উত্তরাধিকার সূত্রে হস্তান্তর করা সম্ভব হবে না। তৃতীয় পক্ষ জমির দাবি করতে পারে এবং আইনি বিরোধ দেখা দিতে পারে।
মূল দলিল ছাড়া কি নামজারি করা যায়?
না, মূল দলিল বা সার্টিফাইড কপি ছাড়া নামজারি করা যায় না। এটি আপনার মালিকানার প্রমাণ। তবে যদি মূল দলিল হারিয়ে যায়, তাহলে আপনি আদালত থেকে ডিক্লারেটরি সুইট করে নকল দলিল পেতে পারেন।
দালাল ছাড়া নিজে নিজে নামজারি করা কি সম্ভব?
হ্যাঁ, এটি সম্ভব। অনলাইন ই-নামজারি সিস্টেম ব্যবহার করে আপনি নিজেই আবেদন করতে পারেন। তবে কাগজপত্র সংগ্রহ এবং সঠিকভাবে পূরণ করা চ্যালেঞ্জিং হতে পারে। জটিল ক্ষেত্রে বা যদি আপত্তি আসে, তাহলে আইনজীবীর সহায়তা প্রয়োজন হতে পারে।
নামজারি প্রক্রিয়া কি সত্যিই ২৮ দিনে শেষ হয়?
আদর্শ পরিস্থিতিতে হ্যাঁ, কিন্তু বাস্তবে এটি আরও সময় লাগতে পারে। যদি কোনো আপত্তি আসে বা কাগজপত্রে সমস্যা থাকে, তাহলে অতিরিক্ত সময় লাগবে। স্থানীয় অফিসের কর্মপ্রবাহও সময়সীমাকে প্রভাবিত করে।
অনলাইনে নামজারি করার পর কি খতিয়ান সরাসরি পাওয়া যায়?
না, প্রথমে অনলাইনে আবেদন করতে হয় এবং অনুমোদনের পর সার্কেল অফিস থেকে খতিয়ান সংগ্রহ করতে হয়। তবে কিছু ক্ষেত্রে ডিজিটাল খতিয়ান অনলাইনে ডাউনলোড করা যায়।
লেখকের শেষ কথা
নামজারি একটি গুরুত্বপূর্ণ আইনি প্রক্রিয়া যা আপনার সম্পত্তির নিরাপত্তা নিশ্চিত করে। সঠিক কাগজপত্র এবং তথ্য দিয়ে আবেদন করলে প্রক্রিয়াটি মসৃণভাবে এগিয়ে যায়। বর্তমান সময়ে অনলাইন ই-নামজারি সিস্টেম সবকিছু সহজ করে দিয়েছে। আপনি ঘরে বসেই আবেদন করতে পারেন এবং অগ্রগতি ট্র্যাক করতে পারেন। নামজারি না করে রেখে দিলে ভবিষ্যতে অনেক সমস্যার সম্মুখীন হতে হবে। তাই দেরি না করে এখনই আপনার জমির নামজারি প্রক্রিয়া শুরু করুন।

